অচেনা শহরে, চেনা-মানুষগুলো কখনও কাছে, কখনও আবার দূরে।।

কর্মব্যস্ত জীবনে পরিবার পরিজন নিয়ে একসাথে বসা, বসে গল্পগুজব করা ইদানিং হয় না বললেই চলে, ছুটির দিনগুলোতে আমরা ছুটি কাটালেও, সেদিন যেন নিজেদের নিজেরাই সময় দিতে আরো বেশী ব্যস্ত হয়ে যাই। সারাবছর এক ছাদের নীচে বসবাস করেও, মা-বাবা, ভাই-কোন, দাদা-দাদী, ভাতিজা-ভাস্তি সহ পরিবারের সকলে মিলে একসাথে বসা, সময় কাটানো, শেষ কবে হয়েছে সেটা মনে করা আমাদের সকলের জন্যই দুষ্কর।

তবে রতনের মন খুব ভালো মনে হচ্ছে ক’দিন ধরে। যথারীতি বারান্দায় আসছে তবে, সেও মুহুত্যের জন্য। বিকেলের পর এদিকে খুব একটা মাড়াচ্ছে না। চা খেতে চাচ্ছে না। সন্ধ্যের সময় ওদের বসার ঘরটাও যেন হৈ হুল্লুরে ভরে থাকছে। মাঝে মাঝে হৈ হুল্লুরের শব্দ ভেসে আসছে, সবাই মনে হচ্ছে টিভির রুমে। সে রকম হৈ হুল্লুর বেশ উপভোগ করছে রতন।

আমাদের পাশের বাসার রতন, বয়স ৭’বছর, একান্নবর্তী পরিবারের বসবাস তার। পরিবারের ছোট-বড় সকলের সাথে গল্পগুজব, হৈ, হুল্লুরের সময়টি বেশ উপভোগ করছে সে। বছরে এমন সময় খুব কম আসে। সবাই ব্যস্ত সবার কাজে, বাসায় ফিরে খাবার টেবিলে খাওয়া তারপর যারযার রুমে চলে যাওয়া। বিষয়টা একদম ভালো লাগে না ছোট্ট রতনের, সারা বছর টিভিতে এমন খেলাধূলা থাকলে খুব ভালো হতো বলে জানায় সে।
সত্যিই তাই, আমরা সবাই যেন যান্ত্রিক হয়ে গেছি, আগে যেখানে বাসায় একটি টেলিভিশন ছিলো, এখন সবার রুমে টেলিভিশন, বড় ঘরের টেলিভিশন দেখার সময় কোথায় আমাদের ?
আমরা সবাই কর্মজীবনে ব্যস্ত থাকি নিজেদের কাজ নিয়ে, কিন্তু আমরা ভাবি না ছোট্ট রতনের কথা, আমরা জানিনা ছোট্ট রতনের পছন্দ ভালোলাগা। রতন সাথে অবশ্য আমার খুব ভাব। ওর ভালো-লাগা মন্দ-লাগা বহুকথার স্বাক্ষী আমি।

সেদিন দেখলাম রতনের মন খারাপ, চুপ করে আছে। এমনিতে প্রতিদিন কাকু, পিশি, জেঠুমনি, দিদিভাই খেলা দেখতে দেখতে কে কি বলেছে, কি হয়েছে, কে কি করেছে, তা তোতাপাখির মতো আমায় শুনিয়ে চলে। কিন্তু আজ রতন যেন চুপ করে আছে। বুঝলাম শেষ হতে চলছে বিশ^কাপের আসর, সে নিয়েই ওমন নিরবতা। তবুও শুনতে চাইলাম কিরে রতন, মন খারাপ ? বলবিনা- ? ক্ষানিক সময় চুপ করে থেকে, যেন অভিমান নিয়ে বলে উঠলো, আর ক’দিন পরেই খেলা শেষ। সেই আবার আগের মতো, যে যার মতো ব্যস্ত, যে যার ঘরে। রতনের একদম পছন্দ না, ওমন পরিবেশ।

সত্যিকার ভাবে বলতে কি, ক্রিকেট নিয়ে সবার মাঝে যেন একটা বাড়তি উন্মদনা। বাসার পরিবেশ যে কিছুটা বদল হয়েছে, সেটা আমি টের পাচ্ছি, বাসায় ফিরেই দেখি একদল হৈচৈ করছে তো অন্য দল নিশ্চুপ, বিরহ ব্যথা তাদের মুখের ভাষা বেরুতে দিচ্ছে না। আমি নিজেরও পছন্দ না চুপচাপ থাকা। তবে বয়স হয়েছে তাই নিতান্তই ওদের পাশে বসে ওদের উন্মাদনা দেখি।

এ শহরে বসবাস আমাদের, তবু সময়ে সময়ে চেনাজানা মানুষগুলো মানুষগুলো কখনও কখনও কত দূরের মনে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *